Sunday, 2 February 2014

একুল ওকুল

এটা যে সময়ের গল্প, তখনও দেব এর ফার্স্টনেম ছিল অরণ্য; সে বাইসেপপ্রবন, আলাভোলা মুখের পাগলু হয়ে ওঠেনি। ওয়াশিং পাওডার বললে খচাৎ করে মুখে নিরমা আসতে শুরু করেছে বটে, তবে কুল মানেই যে ডিউড, তা জানতে ঢের বসন্ত বাকি। 

জ্ঞান হবার পর থেকে, প্রথম নিষিদ্ধ বস্তু বোধহয় কুলই যা একটা বিশেষ দিন পর্য্যন্ত ছোঁয়া বারণ, আর তারপরেই উন্মোচিত হয়ে যেত তার সব স্বাদ-রস-গন্ধ সমেত। তাই কুল মানে আমাদের কাছে শুধু এবং শুধুমাত্রই ছিল ফলবিশেষ - যা প্রধানত দু'প্রকার - টোপা ও নারকোল। নারকোল মাপে বড় হলেও, টোপাই তোফা - কচকচে কাঁচা থেকে, পতপতে পাকা, সবই খেতাম প্রানভরে। 

আমাদের পাশের বাড়িতে একটা ছোটো মাঠ ছিল, আর তার লাগোয়া একটা পেল্লায় কুলগাছ। ও'বাড়ির সবাই আমাদের ভালোবাসতো বাড়ির ছেলের মতোই, তাই ফলচুরি সম্মন্ধে যেসব পথচলতি গল্প শোনা যায়, তা আমাদের তেমন পোয়াতে হয়নি। এমনকি সরস্বতী পুজোর আগে কুল কামড়ে ধরা পড়ে গেলেও দু'একটা ধমকেই ব্যাপারটা চুকে যেতো, বাড়ি অবধি গড়াত না পাপ-কাহিনী। 

'এ'-মার্কা ছবি যেমন করে গোঁফ না ওঠা বয়েসে আ: আ: চু: চু: করে ডাকতো, আর আমরা ছুটে যেতাম ল্যাজ নাড়তে নাড়তে, তেমনই, বিদ্যাদেবীর পুজোর আগেই কুলের স্বাদও মুখে লাগতো অমৃতের মতন।একটু নুন আর গোটাদশেক টক-মিষ্টি টোপা, এই ছিল আমাদের ব্যাডমিন্টন বিরতির এনার্জি-ফুড।সন্ধেবেলা মাঝে মধ্যে পেট যে কামড়াত না এমন নয়, তবে ওসব আমরা লঘুজ্ঞানে ইগনোর দিতাম। শুধু রাতে কুকুর-ডাকে ঘুম ভেঙে গেলে একটু ছ্যাঁত করে উঠতো বুক - এবার বোধহয়  আর পরের ক্লাসের মুখ দেখা হবে না - মা সরস্বতী, রক্ষা করো মা, কচিছেলের পাপ নিওনা। 

পাপ নিয়েছেন কিনা জানিনা, তবে বিদ্যে যে বিশেষ দেননি সে ব্যাপারে সিওর হয়ে গেছি। তাই কোনো ক্লাসে থমকাতে নাহলেও বন্ধুত্বটা গাঢ় হয়নি আমাদের।ওনাকে গুরুত্ব যে বিশেষ দিয়েছিলাম তাও নয়; বরং ওনার বোনের দিকেই চোখ ছিল আমাদের। তাতেও জমেনি ব্যাপারটা। উনিও ধার মাড়াননি। ব্যাঙ্ক-খাতায় বসেছেন মা ভবানী, আর হাতে থেকেছে জ্বলজ্বলে ক্রেডিট কার্ড। 

আসতে যেতে, এই সময়টাতে এখনো চোখে পড়ে ঝুড়িভর্তি সেই অমৃতফল।সন্ধেবেলা হলদে বাল্বের আলোর বাজারে হাওয়ায় ভাসে মনমাতানো সেই গন্ধ। মনে হয় গলি ধরে একটু এগিয়ে গেলেই হয়ত এসে পড়বে সেই কাঁটাওলা ঝাঁকড়া কবেকার কুলগাছটা - এক বুক ভালোবাসা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আমার অপেক্ষায়; যার সব পাতা মনখারাপ রঙের, আর ফলগুলো ছোটবেলার সবকিছুর মতন ঝকঝকে সোনালী।

"খেয়ে দেখুন না একটা" - দোকানদার বলে। সাহস করে মুখে তুলতে পারিনা। যদি এও জীবনের আর সবকিছুর মতো বিস্বাদ হয়ে গিয়ে থাকে? যা রাতে খাবার পরে জেলুসিল না গেলা অবধি মুখকে তেতো করে রাখবে!

- অনিন্দ্য মুখোপাধ্যায়