Tuesday, 4 February 2014

দাদাই

আজ সরস্বতী পুজো ছিল। বাড়িতে পুজো হয়। আনন্দের দিন। অনেকে এলো, ভালো সময় কাটল। এখন মাঝরাত্তির। সব ঠাণ্ডা। চুপচাপ বসে ভাবছি। তারিখ হিসেবে আজ রাতেই আমার ঠাকুরদা, যাকে আমি দাদাই বলে ডাকতাম, মারা গেছিল। তা প্রায় উনতিরিশ বছর হল। আমি তখন ক্লাস থ্রিয়ে। নতুন স্কুলে ভর্তি হয়েছি। দাদাইয়ের সাথেই ট্রেনে করে রোজ যাতায়াত করতাম, যেমন একদম ছোটবেলার প্রাইমারী ক্লাস থেকে করে এসেছি। স্টেশনে নেমে রোজ ওভারব্রীজ পেরিয়ে যেতাম আমরা। একদিন দাদাই লেভেল ক্রসিং পেরিয়ে আমাকে নিয়ে গেল। বলল শরীরটা ঠিক ভালো নেই তাই অতটা উঠতে কষ্ট হবে। সেদিন মাঝরাতেই দাদাইয়ের স্ট্রোক হল। আমার পিসি-পিসোমশাই তখন আর জি কর হসপিটালের রেসিডেন্ট ডাক্তার। ওখানেই দাদাই ভর্তি হল। ছোটদের তো রোজ হাসপাতালে ঢুকতে দেয়না, তাই আমি একটা রবিবারই দাদাইকে দেখতে গেছিলাম। কেবিনের দরজার মুখ থেকে আমি ভেতরে ঢুকিনি। দাদাই হাত নেড়ে ডাকছিল, তাও যাইনি। ঘরটা কেমন অন্ধকার মত ছিল। দাদাই একটা লাল কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়েছিল। গাল ভর্তি দাড়ি। ঠিক মনে নেই, তবে আমার বোধহয় কেমন অস্বস্তি লাগছিল। যে লোকটা এত প্রানবন্ত ছিল, পরিস্কার পরিছন্ন ছিল, সবসময় কিছু না কিছু করত, সে অমন জবুথবু হয়ে শুয়ে আছে সেটা বোধহয় আমার অপক্ক মন মানতে চায়নি। কি জানি!

দু-চার দিন পর দাদাই যেদিন বাড়ি ফিরল সেদিন গাল আগের মতই পরিষ্কার করে কামানো। বাড়ি ভর্তি লোক। লম্বা দালানটাতে খাটের ওপর শোয়ানো আছে দাদাইকে। বুকের ওপর অনেক ফুল সাজিয়ে রাখা। আমি বসে আছি দোতলায় যাবার সিঁড়িটায়। মনে আছে আমাকে অনেকে অনেক কিছু বোঝাচ্ছিল। এখন বুঝি ওটাকে বলে সান্ত্বনা। সেই সান্ত্বনাগুলো শুনেই আমি অনুভব করতে শুরু করলাম যে আমার এই অবস্থায় খুব কষ্ট পাওয়া উচিত, ভাবা উচিত আমি কি হারালাম। সত্যি বলতে আমার তখন একটা অন্যরকম লাগছিল। সেটা না ঠিক কষ্ট, না দুঃখ, না অন্য কিছু। আজ বুঝি ওটার নামই শোক। আর এও বুঝি শোক এই জন্যই এত পবিত্র; এতে সব অনুভুতি মুছে অভাবের যন্ত্রণাটাই মুখ্য হয়ে ওঠে।

দাদাই চলে গেল। বাবা-মায়েরা হবিস্যি করল। দাদাইয়ের শ্রাদ্ধ মিটল। ঠাকুমার শাড়ি সাদা হল। আবার শুরু হল জীবন। তারপর থেকে প্রাতহ্যিক কাজে কার কি অসুবিধে হল জানিনা, আমি একা হয়ে গেলাম। যে আমাকে ঘিরে রেখেছিল, আর হয়ত আমিও যাকে ঘিরে ছিলাম, আর এই ভাবে একে অপরের কক্ষপথে ঘুরে চলেছিলাম জ্ঞান হওয়া থেকে, সে টুক করে চলে যাওয়ায় আমার চলার ছন্দ একেবারে নষ্ট হয়ে গেল। হয়তো সেই অভাববোধ থেকেই আমার অবচেতন খুঁজে বেড়াত দাদাইকে; আর আমার সুস্থ সচেতন বিচারবোধ বলত সে আর নেই, পুড়ে এক্কেবারে ছাই হয়ে মিশে গেছে জলে মাটিতে হাওয়ায়।  এই দুইয়ের টানাপোড়েনে নাজেহাল হয়ে গেলাম আমি। তখন সব শোক দুঃখ পেরিয়ে একটা ভয় আর কনফিউশন মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। রাতে ঘুম হতনা, দিনে স্বস্তি পেতাম না। রাগ হত নিজের ওপরেই।

এমন চলতে চলতে সময়ের আশ্চর্য ওষুধে ভালো হতে থাকলাম আমি। স্মৃতি নিশ্চয়ই রইল, কিন্তু রোজ আর মনে পড়ে না দাদাইকে। নতুন নতুন সম্পর্ক, কাজ, অকাজের মধ্যে ডুবে যেতে যেতে আমার রোজের জীবন থেকে দাদাই মুছে গেল কবে যেন। এমনকি স্বপ্নেও আসেনা দাদাই। চেহারাটা মনে থাকলেও গলার স্বরও ভুলে গেছি অনভ্যাসে।  আজ হয়তো মাসে একবারও এক মিনিটের জন্যও স্থির হয়ে দাঁড়াই না ছবির সামনে, যেখান থেকে দাদাই দিন রাত হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে আছে আমাদের দৈনন্দিনতার দিকে।

রোজ থামিনা। তবে এই মুহূর্তে থামছি। তোমার স্মৃতিতে আচ্ছন্ন সময়বালি ঝরে যাচ্ছে দেওয়াল ঘড়ির টিকটিকে। এই গভীর রাতের শব্দহীনতা, আলো আবছায়া, হুল্লোড় শেষের বিষাদ, কাগজে কলমে তোমার স্মৃতিচারণা, এই আমার তোমাকে তর্পণ, আদর, প্রণাম।

তুমি আমার কাছে বেঁচে আছো আমাদের মেয়ে বিনির আমার বাবাকে আধোস্বরে "দাদাই" ডাকে। এই ভাবেই থাকবে তো দাদাই?