Thursday, 1 May 2014

আমার ১লা বৈশাখ

সস্তা ইংরিজীর এতটা প্রাদুর্ভাব না থাকলেও, বাংলা ক্যালেন্ডারের তেমন জমকদার বাদশাহি আমল ছিলনা সেই কালেও।  দরজা-কপাটের পেছনে, চিনের নদীদৃশ্য, মেরুভাল্লুকের খুনসুটি, আর কিছু না হলে আলাভোলা ন্যাড়ামুণ্ডি বাচ্ছার ছবিওয়ালা, চকচকে পাতার ইঞ্জিরি ক্যালেন্ডারের পেছনে ঘাপটি মেরে থাকতো মলিন পাতার বাংলা তারিখসূচি। বাংলার এন্তেকাল যে ঘনিয়ে আসছে তা আমাদের মত কম আই কিউ-এর মানুষরাও বিলক্ষণ টের পাচ্ছিল বঙ্গাব্দের হিসেবপত্রটির প্রাত্যহিক পসিশন দেখেই।  পৈতে, বিয়ে আর বিধবাদের বিভিন্ন ইয়ের তারিখ সাপ্লাই করা ছাড়া এর বিশেষ কাজ ছিলনা। আর এর উদরেই ঘুমিয়ে থাকতো বাংলা মাস-তারিখগুলোও। স্কুলের টেক্সট বইয়ে ছয় ঋতু বারো মাসের মুখস্থ বিদ্যার মধ্যে দুটো মাসই স্যালুট মারত আলাদা করে - বৈশাখ আর আশ্বিন। আশ্বিনে তো দুর্গাপুজো, আর বৈশাখে দোদমা - পয়লা বোশেখ বছরপুজো, আর পঁচিশে রবিপুজো।

  দুর্গাপুজোকে এই  বংভুমে কেউ হারাতে পারবে না ঘনঘটায়। ওই চার-পাঁচদিন ধরে জ্বলা উৎসবের তুবড়ির কাছে আর সবই ফিকে। আর পঁচিশে বৈশাখের তো কেতাধারী ব্যাপার। সেই সময় যদিও এখনের মত কবি ঠাকুরের মুখোশ পরে ঘোরার চল হয়নি, তবু  কমপক্ষে একখানা "গান-নাচ-তবলা-অঙ্কন শিক্ষাকেন্দ্র"-এ অফিসিয়াল শিক্ষার্থী হওয়া, বা কিছু না হলেও খান পাঁচেক প্যাঁওপ্যাঁও জানা মাস্ট ছিল। না হলে এদিনে কল্কে পাওয়া যেত না। তাই বিনা ঝঞ্ঝাটের পয়লা বৈশাখ, তার নিজের মত করে, চেপেচুপে মানিয়ে গুছিয়ে জায়গা করে নিয়েছিল আলুপোস্তর আপামর বঙ্গজীবনে। যদিও এটা যে সময়ের কথা, সেই নব্বইয়ের দশকে, আমাদের মত মফস্বলের চাকরিজীবী মধ্যবিত্ত বাড়ির ছোটদের জীবনে বিশেষ কোন আনন্দবন্যা বইত না ওই দিনে। বাকি সব উৎসবের যেমন একটা প্রস্তুতি নিতে হয়, তেমন কিছু দাবি-দাওয়াও ছিলনা এর। ফলে আচমকা, কাঠফাটা গরমে এসে উপস্থিত দিত একলা বৈশাখ। লজ্জার মাথা খেয়ে বলছি, একে আলাদা করে তারিখ বলে গন্যও করিনি কোনদিন। '১লা' কে যে 'পয়লা' বলে আর 'পয়লা' মানে যে 'প্রথম', এও জেনেছি বেশ পরে। "চোদ্দ বা পনেরোই এপ্রিল পয়লা বৈশাখ" - অপমানজনক পরগাছার মত ইংরিজী ক্যালেন্ডারের দয়াদাক্ষিন্য নিয়ে এমন ভাবেই বেঁচে গিয়েছিল বঙ্গাব্দের জন্মদিন। হতে পারে, বাংলার সুমহান ইতিহাসের উজ্জাপনদিবস চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে, পাঁজাকোলা করে আনন্দযজ্ঞে ফেলে দেবার মত পোপ-তুল্য মিডিয়া তখন গোকুলে বাড়ছে; আর তাই, প্রভাতফেরীতে বেরিয়ে ঘামে পতপতে হয়ে, বিনুনিবালিকার সঙ্গে চোরাচাউনি বিনিময়ের শুভ সকাল ছাড়া একে আমরা আর কিছু ভাবতে শিখিনি সেইদিন। তবে হ্যাঁ, একটা বা কখনও দুটোও নতুন জামা হত!


  যাইহোক, সকালটা তাও হট্টগোলে শুরু হলেও, বাকি দিন আলুনি ছুটি। রবিবারগুলোর মতোই ঝামাপোড়া হয়ে মাঠে বল পেটানো, পুকুরে ঝাঁপাই ছোঁড়া ইত্যাদি। কিন্তু কিন্তু কিন্তু - বিকেলের পর হত সেই মজাটা! দুপুরের শেষ দিক থেকেই উত্তেজনা বাড়তে থাকতো। ওইদিন বিকেলে আর খেলতে-টেলতে যাওয়ার নামটি নেই। রোদটা একটু পড়ে এলেই, মাকে দিয়ে বাবাকে জিগ্যেস করাতাম কখন হালখাতা করতে যাবে। মুদি-ষ্টেশনারী-দরজি-সেলুন-ওষুধ মিলিয়ে কমবেশি সাত-আট দোকান থেকে নেমতন্ন পেত বাবা। কয়েকজন দিত ফ্যারফ্যারে নিমন্ত্রণপত্র আর বাকিরা মুখেই বলে দিত আগে কোনদিন, বানিজ্যক্ষণে। বাবার যাওয়ার তাগিদ কতটা ছিল সেটা জানার চেষ্টা করিনি কখনও, তবে বাধ্যতামুলক ভাবে, সামাজিকতার খাতিরে হয়ত তাঁকে যেতে হতই।  অন্যান্যদিন বাবা বাড়িতে না থাকলেই ভালো লাগত বেশি - বাঁদরামো করে, পড়ায় ফাঁকি মেরে পার পাওয়া যেত, কিন্তু ওই দিন বাবা পরম বন্ধু। গা-টা ধুয়ে, ঘাড়ে পাউডার লেপে, কেরোসিনের বদবুওয়ালা নতুন জামা চাপিয়ে, বাবার সাইকেলের পিলিয়ন-রাইডার হতাম। গাঁদা ফুলের মালা ঝোলানো দোকানগুলোতে এক এক করে ঢুঁ মারতাম বাপ-ছেলেতে। দরজার দু'ধারে রাখা থাকত সিঁদুরলেপা ডাব, সকালের পুজোর টুকরো-টাকরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকত তখনও। মালিকের একটু বিশেষ সাজ - একটা নতুন পাঞ্জাবি কি জামা। পরিবারের লোকজনরাও আসত দোকানে, দেখাশোনা করত অভ্যাগতদের। কিছু কিছু দোকানে চেয়ার পাতা থাকত আপ্যায়নের জন্য, কেউ কেউ আবার বসাত গান বাজাবার বক্স। বাবা ক'টাকা দিয়ে হালখাতা করত জানিনা, তবে আমার জন্য টাটা-বিড়লা ছিল সেই দোকানী যিনি আতিথেয়তা দেখাতেন কমলা রঙয়ের স্বর্গীয় পানীয়র বোতল খুলে - যার নাম ছিল গোল্ডস্পট!  


  এর আগে পাড়ার এক অকালপক্ক দাদার থেকে 'বিউটিস্পট' শিখেছি। পাড়ার এক নতুন কাকিমার চিবুকের কাছে একটা ছোট্ট তিল দেখিয়ে শিখিয়েছে ওই কালো ডট কেমন করে একধাপ বাড়িয়ে দেয় সৌন্দর্যকে। আর এতো সোনার ফোঁটা, আরেক কাঠি ওপরে!  সাদাকালো ঝিলঝিলে টিভি-তে তখন বিজ্ঞাপন দেখাচ্ছে - একটি ঝরঝরে স্মার্ট তরুন আর এক স্কার্ট পরিহিতা রূপসী স্কেটিং করতে করতে ঝড়ের মত আসছে  একটা পার্কের মধ্যে দিয়ে। মেয়েটি এসে বসে পড়ল পার্কের একটা বেঞ্চে। পিছনে তাকিয়ে দেখে প্রেমিকপ্রবর গায়েব। প্রেমিকা তাকায় ইতিউতি, হঠাৎ দেখে শূন্য থেকে লাফিয়ে নামছে হিরো, হাতে দুটো গোল্ডস্পটের বোতল।


  প্রেমিকা নেই, টিভি-র ছেলেটার মত চালাক চতুরও নই, তবু গোল্ডস্পট চাইই। খোঁজ খোঁজ খোঁজ। রঙ দেখিনি তো কি হয়েছে, ঢং দেখলে ঠিক চিনে ফেলব। আমাদের ওখানে তখনও যায়নি; কে খাবে অত পয়সা দিয়ে? প্রথম খেলাম কলকাতায় মামারবাড়িতে এসে। কি দেখতে, কি খেতে! ভেবে ফেললাম, অনেক টাকা হলে দু'বেলা খাব!


  সাদামাটা বেঁটেখাটো বোতল, গোল স্টিকারে লাল আর গাড় নীলে লেখা গোল্ডস্পট, তাতে একটা স্ট্র ডুবিয়ে চোঁ করে মেরে দাও টকমিষ্টি কমলালেবুর সঙ্গে ঝাঁঝাল সোডা মেশানো স্বাদের সোনারঙা বরফঠাণ্ডা সরবত  -  এই ছিল আমার পয়লা বৈশাখের একমাত্র পাখির চোখ, যাতে তীর টিপ করে আমি বসে থাকতাম সারাদিন। সবাই তো আর তেমন উদার, অতিথি বৎসল ছিলনা, অনেকে বিদেয় করত গুটিকচুরি-দরবেশ গড়ানো বাক্স আর ক্যালেন্ডার ঠেকিয়ে; আর যারা মহান টাইপের, তারা দোকানের কর্মচারীদের ফরমাস করতো একটা বোতল খুলে হাতে দিতে।  'ক্লুপ!' করে খুলে, ঠাণ্ডা ধোঁয়াওঠা বোতল যখন সামনে এগিয়ে দিত, নিজেকে মনে হত খাঞ্জা খাঁ, আলগোছে বসে আছি জামদানি শাল জড়িয়ে, উর্দি পরা পেয়াদা সেলাম ঠুকে হাতে ধরিয়ে দিচ্ছে খুসবুদার সরবত! বাবাকে দিলে বাবা খেতনা - বড়দের ব্যাপার-স্যাপারই অন্যরকমঃ ভাল জিনিস খাবেনা, ভাল জায়গায় যাবেনা - সব ভাল, আনন্দের জিনিসগুলোকে তালা বন্ধ করে তিতকুটে জীবন কাটালেই যেন নোবেল পাবে। সে যাকগে! তা বাপ খেলোনা, ছেলেকে দিয়ে দে! তা না! বোতল আবার ঠাণ্ডা বাক্সে চালান; পরের খদ্দেরর অপেক্ষায়। অনেক কষ্টেশিষ্টে একবার পাঁচ বোতল সাবড়েছিলাম সব দোকান মিলিয়ে। কি ভাগ্য! পরে রাতে শুয়ে মনে হয়েছিল, আজ একটা লটারি কাটলে হত।


  অনেক পরে, যখন লায়েক হলাম, দেশ-বিদেশের দু-চার পাতা উল্টে আঁতলামোর আঁক কাটতে শুরু করলাম যত্রতত্র - অবাক লেগেছিল এটা ভেবে যে একটা মার্কিন পানীয় কি আশ্চর্যভাবে জায়গা করে নিয়েছে একটা এঁদো দেশের গ্রাম্য সামাজিকতার উপকরণ হিসেবে; এমনকি সেখানকার এক উঠতি কিশোরকে, যে কিনা সম্পূর্ণ অচেতন তার শিকড় সম্পর্কে, তাকেও মনে করিয়ে দিচ্ছে এই বিশেষ দিন। আরও পরে জেনেছিলাম এগুলোই বিশ্বায়নের পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া; তৃতীয় বিশ্বকে নিগড়ে নেবার ছক। অনেক কিছু নিয়ে মনে একটু বিপ্লবভাব জেগেছিল, কিন্তু গোল্ডস্পট নিয়ে নয়। ওই জিনিস না খেলে ভগবান পাপ দেয়।


  যাই হোক, গল্পে ফিরি। আরও বছর দুয়েক কাটল। বাবার সাথে সাইকেলে চাপতে এখন লজ্জা করে। বন্ধুরাই বেশি আপন, জড়িয়েজাপটে বাঁচার সঙ্গী। স্বপ্নের জাগলিং করি আমরা একসঙ্গে। গোল্ডস্পট খাবার জন্যও এখন আর সারা বছর বসে থাকতে হয় না। দোকানে দোকানে সাজানো থাকে এই মায়া পানীয়। হাত খরচ জমিয়ে কখনও সখনও খাই। কিন্তু আরও অনেক কিছু এসেছে এখন - লিমকা, থাম্বস আপ, পেপসি, মিল্কোস, সেভেন আপ। ঝাঁজ, স্বাদ, স্মার্টনেসে তারা গোল্ডস্পটকে হারিয়ে দেয় কখন যেন। টিভির বিজ্ঞাপন সেখায় কোনটা ছেলেদের খাবার, আর কোনটা মেয়েদের জন্য। কমলা সরবত মেয়েলি, আমি আর খাবনা; নতুন সুন্দরী প্রতিবেশী-র জন্য তুমুল বৃষ্টির মধ্যে রাস্তায় নেমে, শাটারের তলা দিয়ে ঝটতি গলে আমির খান বের করে নিয়ে আসে একবোতল পেপসি। আমি ওটাই খাব। হাতে কোলা, কলার তোলা। গোল্ডস্পট নিপাত যাক।


তারপর কত বছর ছোট্ট ডিঙি নৌকোয় চলেছি ঢেউ ভেঙে ভেঙে, পেরিয়ে যাচ্ছি কত রঙ-বেরঙের দ্বীপ। কোথায় যাচ্ছি, কেনই বা যাচ্ছি, জানিনা। পুরনো বন্ধু, পুরনো ঘর, পুরনো ঘাট, পুরনো পয়লা বৈশাখগুলোকে সেই কবে ফেলে এসেছি দিকচক্রবালরেখার ওদিকে। ঠাঠা দুপুরে তেষ্টা মেটাবার জন্য এখন খুঁজে বেড়াই গোল্ডস্পট; চৈত্রসেলের বাজারে খুঁজি কোথাও  গোল্ডস্পটের পুরনো স্টক আছে কিনা; আধুনিক গয়নার দোকানের পয়লা বৈশাখের উৎসবে, হাজার রোশনাই, লক্ষ লোকের আনকোরা ভিড়ে, খুঁজি শুধু একটা সাদামাটা বেঁটেখাটো বোতল ভর্তি কমলা পানীয়। নেই!


  তাই আজ আমার আর কোন পয়লা বৈশাখ নেই। কোন রৌণক, কোন মহার্ঘ্য উৎসবই আর ফিরিয়ে দিতে পারবে না সেই সরল সন্ধেগুলোকে, আন্তর্জাতিক জীবনে আর কোন কিছুই বুনবেনা বিস্ময়ের সলমাজরি। শুধু যখন, বছরের প্রথম দিনের ডুবসূর্যের কমলা, সোনালি আলোয় মায়াবী হয়ে আসে এই ম্লান শহর, বুঝতে পারি 'গোল্ড স্পট' রয়ে গেছে কোথাও একটা। কোথায় জানিনা। খুঁজতে গেলে আবার বসে থাকতে হবে একটি বছর   - ১লা!


(এই লেখাটি 'এই সময়' সংবাদপত্রে ১৫ই এপ্রিল ২০১৪-এ প্রকাশিত হয়েছিল।)