Wednesday, 8 October 2014

শেষ ট্রেন থামে এক ভিনদেশী স্টেশনে

জয়ন্তদার বরাবরই টেনশনের ব্যামো ছিল। মাথায় মুখে মাফলার জড়িয়ে, হাতদুটো তুঁষের চাদরের মধ্যে সেঁধিয়ে দিব্যি ঘুমোচ্ছিল নাল গড়াতে গড়াতে, হঠাৎ চমকে উঠে জিগ্যেস করল, 'এই ট্রেনের ড্রাইভার আর গার্ডটা বাড়ি ফিরবে কি করে র‍্যা?'  আমরা তখন সোয়েটার-চাদর জড়িয়ে-মড়িয়ে, এ ওর গায়ে পড়ে ঝিমোচ্ছি, বন্ধ জানলার ফুটিফাটা দিয়ে হু-হু করছে ঢুকছে কনকনে হাওয়া, এমন সময় এই উৎকট প্রশ্ন শুনে সবাই হাঁ-হাঁ করে উঠলাম - 'শালা ঘুমোও তো, নইলে দরজা দিয়ে ঠেলে ফেলে দেব।' পরে স্টেশনে নেবে, ওভারব্রিজের দিকে হাঁটতে হাঁটতে আসার সময় চোখে পড়ল ট্রেনের গার্ড দরজা খুলে ঝুঁকে সিগনাল দেখছে। তখন মনে হল, সত্যি তো, এরা বাড়ি ফিরবে কি করে এই লাস্ট ট্রেনেকে শেষ স্টেশনে পৌঁছে দিয়ে?
  অবিশ্যি ওই সাড়ে বারোটা-একটার সময় শেষ ট্রেনে পৌঁছে সবাই যে এত সিমপ্যাথেটিক চিন্তা করবার অবস্থায় থাকত তা নয়। যে ক'জন সুস্থ অবস্থায় ফিরত তাদের বেশিরভাগই ব্যবসায়ী অথবা ইভেনিং ডিউটি ফেরত মানুষজন; তারা কোনক্রমে নিজেদের মালপত্র, পয়সাকড়ি সামলে, সন্দেহজনক লোকজনদের চোরাগোপ্তা নজর এড়িয়ে বাড়ি ফেরবার জন্য ব্যস্তসমস্ত। বাকিদের ঠিক ভদ্দোরলোকের পর্যায় ফেলা যায় কিনা সে বিষয়ে একটা মানবিক ডিবেট আজীবন চলতে পারে। তারা হয় মোদোমাতাল-পাতাখোর, নয় খোচড়, নয় দালাল, ভিকিরি, কাজে বেরনো ছিঁচকে চোর, হকার, আর না হলে আমাদের মত কিছু বেকার ফুর্তিবাজ, যারা হয় কোন বিয়েবাড়ি, সত্যনারায়ন সাবড়ে নয় কোন টিউশানি শেষে অন্য স্টেশনে রাতের আড্ডা সেরে ফিরত হররা ছড়াতে ছড়াতে।  বরযাত্রী-কনেযাত্রী পার্টিও থাকত বিয়ের সিজনে। 

  ট্রেন যদি জলে সাঁতরে চলত, বা হাওয়ায় উড়ত, তাহলে লাস্ট ট্রেন কখনই গন্তব্য স্টেশনে পৌঁছত না; সামনের দিকে গোঁত্তা মেরে, হুমড়ি খেয়ে পড়ত। কারন, শেষ ট্রেনের প্রথম কম্পার্টমেন্টেই বেশিরভাগ প্যাসেঞ্জার এসে জড়ো হয়। সকালবেলায় যারা কিনা একটা ফাঁকা কামরা, একটা জানলার ধারের জন্য লাফ-ঝাঁপ দিয়ে সার্কাসকে হার মানায়, তারাই রাতের শেষ গাড়িতে লোকের গায়ে গা ঠেকিয়ে বসে, হাতের সোনার আংটি চট করে লুকিয়ে ফেলে চোরা পকেটে, অন্তর্বাসের খাঁজেখোঁজে লুকিয়ে রাখে সবেধন নগদ টাকা, আড়চোখে তাকিয়ে থাকে লুঙ্গিপরা ঢ্যাঙাটার দিকে। 

  লাইনভেদে লাস্ট ট্রেনের সীন একেক রকম। হাওড়া মেনলাইন একটু নিরামিষ ধরনের হলে, কর্ডলাইন একটু বেয়াড়া, শেয়ালদা-নৈহাটি হয়ত ডাকাবুকো আর শেয়ালদা-ক্যানিং এক্কেবারে যাইরে কয় ডেঞ্জারাস। কোথাও হাফ-দামে সওদা হয় ভাঙা বিস্কুট, কোথাও বেঁচে যাওয়া পোকাধরা সব্জি, কোথাও বসে তিনপাত্তির আসর, কোথাও বা রামের পাঁইটের ছলকানো কাউন্টার ঘুরে বেড়ায় হাতে হাতে, বখাটে ছেলে দরজার রড ধরে ঝুলে বুকখোলা জামা দিয়ে নিয়ে নেয় সুতীব্র বাতাস, ভক্তিগীতির আসর বসিয়ে শেষ রাউন্ড খুচরো তোলে অন্ধ গায়ক আর তার বউ, পাড়ার পাগলকে শুনশান কামরা দেখে লাথি মেরে তুলে দিয়ে যায় ক্লাবের ছেলেরা, ন্যাতাকানি চাদর মাথা থেকে মুড়ে ধু-ধু লেডিস কামরার সিটে শুয়ে ফ্যান্টাসি সাঁতলায় পা-কাটা ভিকিরি, দুলে দুলে দৌড়নো, হাতলে হাতলে ঠোকাঠুকি লাগানো দুরন্ত ট্রেন নিঝুম স্টেশানে নামিয়ে দিয়ে যায় বাঁশে বাঁধা, কাটাপড়া বেওয়ারিশ লাশ। ঘুটঘুটে কালো রাতের কপালে দগদগে লাল টিপের মত সিগনাল সম্মতির সবুজ দিলেই আবার ছুট দেয় বেপরোয়া রেলগাড়ি। শেষ ট্রেনের ঝমঝম আওয়াজ মিলিয়ে যাবার পরেও বহু দূর থেকে ওভারহেড তারে দেখা যায় আচমকা বিদ্যুৎঝলক।  

       একবার লাস্ট ট্রেনে টিউশন পড়ে ফিরব ভাটপাড়া থেকে ব্যান্ডেল। তারপর সেখান থেকে আবার ট্রেন ধরে বাড়ি। স্টেশনে যখন দলবেঁধে পৌঁছেছি তখনও ট্রেন আসতে দেরি। যা বয়েসের যা ধর্ম। খানিক বেয়াদপি না করলে ভাত হজম হয় না। স্টেশন ছেড়ে লাইন ধরে কিছুটা এগিয়ে গেলাম। গিয়ে কয়েকটা পাথর তুলে রেললাইনে ঠুকতে লাগলাম কয়েকজন, আর দু'জন শেয়ালডাক ডাকতে লাগল গলা ছেড়ে - 'হু--ক্কা হু--য়া'। শীতকালের শুনশান অন্ধকারে, পাথরের তালে তালে, সে এক বিচিত্র সঙ্গীতায়োজন। সেকেন্ড তিরিশেক এরকম চলার পরেই শুনতে পাওয়া গেল হুইসেলের আওয়াজ আর মুখে এসে পড়ল জোরালো আলো। বুঝলাম কয়েকজন ছুটে আসছে আমাদের দিকে। কাছাকাছি আসতে বুঝলাম পুলিশ! পালা পালা! কোথায় আর পালাবো? খোট্টা হাতের সজোর ঝাপড় পড়ল কয়েকটা আর তারপর হাত মুচড়ে নিয়ে চলল স্টেশানের দিকে। 
- 'আমরা কিছু নেহি কিয়া স্যার।' 
- 'মাজাক? কেয়া কিয়া বোল? অ্যায়সা কেয়া কিয়া যো সিগনাল মে গড়বড়ি হো গ্যায়া? চল স্টেশন মাস্টারকে পাস।'
গিয়ে মালুম হল যে সিগনালের কিছু একটা গোলযোগ হয়েছে, আর যার ফলে সিগনাল একবার লাল আর একবার সবুজ হচ্ছে অকারন। তখন একটা মেল ট্রেন যাবে, আর তাই ওনারা ভাবছেন আমরা কিছু একটা করেছি ট্রেন অ্যাকসিডেন্ট করাবার মতলবে। বোঝো! আমাদের মধ্যে একজন বুদ্ধি করে কলেজের আই-কার্ডটা দেখাল। একজন পৈতে বের করে দিব্যি-টিব্যি দিল। কিন্তু কে শোনে কার কথা। চড়-থাপ্পড় পড়তে থাকল মুহুর্মুহু। প্যান্ট-ফ্যান্ট হলুদ হবার জোগাড়। তা তখনই, হয়ত রেগুলার গায়েত্রি জপার কারণে বা তখনও অবধি নিষিদ্ধ-মাংস না ছোঁয়ার পুণ্যি অর্জনের কারণে, একটা ফোন এলো স্টেশনমাস্টারের কাছে, আর তাতে আগের স্টেশন থেকে জানালো সিগনালে একটা টেকনিকাল ফল্ট হয়েছিল, সেরে দেওয়া হয়েছে। ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল। কিন্তু পুলিশ ছাড়ল না। বাপ-পিতেমোর নাম-ঠিকানা লিখে, লাস্ট ট্রেনে তুলে, হিঁচড়ে ব্যান্ডেলে নামিয়ে, সবকটাকে অন্যান্য ট্রেনে চাপিয়ে তবে তারা বিদেয় হল। আমরাও গলার কাছে হৃৎপিণ্ড এনে, গরু চোরের মত তাকিয়ে, গুটিসুটি বসে রইলাম বাড়ির স্টেশন না আসা অবধি। সেই শেষ, আর ও চত্বর মাড়াইনি। 

  কালেভদ্রে, দূরে কোথাও বেড়াতে যাবার প্রয়োজন ছাড়া, কোন স্টেশন চত্বরই আর প্রায় মাড়াইনা আজকাল। কখনও অজান্তে, ভীষণ শীতের গভীর রাতে, শেষ ট্রেনের আবছা ডাক মায়া ছড়ায় চেতনা জুড়ে। হয়ত মাঝরাতের চায়ের স্টল আজও ধোঁয়া ওড়ায় নিরালা স্টেশনে, দেওয়ালে ঠেস দিয়ে, শেষ খদ্দেরের আশায়, ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে সস্তা সাজের আধা ঘুমন্ত বেশ্যারমণী, মা কুকুর বাচ্ছাগুলোকে নিয়ে কুন্ডুলি পাকায় আগুন ঘেঁসে, উর্দিখোলা পুলিশের দল আসর জমায় কাঠের বেঞ্চে, মেল ট্রেনের অ্যানাউন্সমেন্ট প্রতিধ্বনিত হয় নিশি লাগা এলাকা জুড়ে, দমকা হাওয়ায় ঘুরতে থাকে প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে থাকা টুকরো কাগজ প্লাস্টিক শাল পাতা, ভাঙা চায়ের ভাঁড়গুলো একমনে সাজিয়ে খেলা করে স্টেশনাশ্রিত পাগল, ঠেলাট্রলিতে গামছা পেতে নিরাশক্ত নিদ্রা দেয় সুঠাম কুলি, হাঘরে দম্পতি সোহাগ সারে প্লাস্টিকের আড়ালে, জোছনা লাগা অতিকায় গাছগুলো থেকে টুপটাপ ঝরে পড়ে আলগা ফুল। নিশুতি রাত তীব্র হেডলাইটে চিরে, মিঠে আর্তনাদে চরাচর ভাসিয়ে ছুটে যায় গতিবান লাস্ট ট্রেন। 
  শুধু আমিই আর যাইনা সেখানে। দুরপাল্লার হাওয়াগাড়িতে আমি ডিঙিয়ে এসেছি কত হাজার আলোকবর্ষ। কতশত সুখ, দুঃখ, অপমান, শোক, প্রেম, আমোদ, উৎসবের স্টপেজ পেরিয়ে তাঁবু ফেলেছি আধচেনা, ভিনদেশী ইস্টিশনে।

  দেয়া, আমার চার বছরের মেয়ে - যেখানে আমার ট্রেন থেমেছে এখন। যখনই কোন স্টেশনে থেমেছি, ভেবেছি কখন ছাড়বে আর চলতে শুরু করব সামনে, ছুটে যাব গন্তব্যের দিকে। কিন্তু এবারের এই স্টেশন, মনে হয়ে এখানেই গাড়ি থেমে থাক অনন্তকাল। কিন্তু এও জানি, আর সব যাত্রার মত একদিন স্টেশন পড়ে থাকবে আর আমার লাস্ট ট্রেন আমাকে নিয়ে ছুটে যাবে সুদুর নীল অন্তরীক্ষে - সেখান থেকে না আছে ফেরার কোন ডাউন লাইন, না আছে ভোরের কোন ফিরতি ট্রেনের আশা। লাস্ট ট্রেনে পৌঁছনো, ঘুটঘুটে অপার্থিব শেষ ঠিকানাটা থেকে, ঝলমলে আলোজ্বলা দেয়া-র স্টেশনটা অন্তত দেখা যাবে তো?

(আমার এই লেখাটি 'এই সময়' 'রবিবারোয়ারি'-তে সেপ্টেম্বর ২০১৪-তে প্রকাশিত হয়েছিল।)