Monday, 15 December 2014

মেসো, মাসি আর মশার গল্প

ভুত-পেত্নি-দত্যি-দানো ইত্যাদিতে আমার অগাধ বিশ্বাস। কোনও বিজ্ঞান, উত্তরাধুনিক থিসিস, উগ্র পড়াশুনো সেই বিশ্বাস টলাতে পারবেনা।  বিশেষ করে অতৃপ্ত আত্মার ব্যাপারটাতে তো আমি সেইসময় থেকেই টোটাল অটল, যেসময় সন্ধেবেলা লোডশেডিং হলে চিমনির আলোয় মাদুরে বসে, পড়া ফেলে 'খুন-খারাবি'তে মনপ্রান ঢেলে দিতাম। অর্জুনের অন্ধকারে তীর চালাবার গল্পটাই আমাকে ইন্সপায়ার করেছিল কিনা এখন আর ঠিক মনে নেই, তবে বিন-বিন আওয়াজ আর অস্থানে-কুস্থানে হুল ফোটালেই, চোখে না দেখেই, প্রায় ব্রুস লি কায়দায়, সপাট চাপড়ে সেরে দিতাম এক একখানাকে। স্কিলটা এমন সাংঘাতিক পর্যায় পৌঁছেছিল যে এক থাবড়ায় দুটো, এমনটি তিনটেও হাঁকড়েছি কখনও সখনও । শব দেহ তুলে তুলে সাজিয়ে রাখতাম চিমনির কাছাকাছি, যাতে হিসেব রাখতে পারি এক এক ঘন্টায় কতগুলোকে ফৌত করেছি। কিন্তু এহেন আমি, যার শত্রু নিধন ক্ষমতা কিনা প্রায় মহাকাব্যিক পর্যায়ের, কোনদিন শেষ করতে পারিনি দলে দলে উড়ে আসা মশক বাহিনীকে। যত মেরেছি, দলে তত ভারি হয়ে হই হই করে তেড়ে এসেছে আর শেষমেশ বাধ্য হয়ে আমাকে মেনে নিতে হয়েছে যে অপঘাতে মৃত মশাদের অতৃপ্ত আত্মার দলই আসলে অশরীরী আক্রমন শানাচ্ছে, যাদের সাথে লড়াই করে ওঠা যেকোন ইহলোকের প্রাণীর ক্ষমতার বাইরে। এক্ষেত্রে এলিয়েনের থিওরিটাও খাড়া করা যেত, নেহাত সেসময় জ্ঞানের পরিধিটা টেক্সট আর রাশিয়ান বইয়েই সীমাবদ্ধ ছিল বলে কল্পনার বাছুরটাকে ন্যাজ মুলে অতটা দৌড় করাতে পারিনি। তা যা হোক, মোটকথা জেনে গেলাম এই মশার সঙ্গে অতি গভীর এক পারলৌকিক যোগ আছে, যার সাথে পেরে ওঠা আমার মত বকধার্মিক বং-পুঙ্গবের কম্মো নয়।  তখন থেকে হাল ছেড়ে দিয়ে, সদাকরুন চিত্তে, বৎসরের পর বৎসর ধরিয়া, সহস্র অযুত কোটি কামড় খাইয়াছি এবং অন্যদের হাবভাব দেখে দেদার মজাও লুটেছি। 

     কলকাতা থেকে ঘণ্টাখানেকের দূরত্বে, গ্রামঘেঁষা মফস্বলে আমার ছোটবেলা কেটেছে মশাদের সাথে চূড়ান্ত অশান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে। কয়েককাটা জমির ওপর দেড়তলা বাড়িটা ঘিরে ছিল কেয়ারি করা বাগান। দিনের বেলার দেখনশোভা বিকেল হলেই বদলে যেত আতঙ্কে। কোন কেয়ারির কেয়ার না করে, সেই বাগান থেকে পালে পালে মশা এসে ঢুকত জানলা দিয়ে। গ্রিলে জালের ঢাকা, চপচপে করে মাখা বিলিতি কায়দার ওডোমশ কোন কিছুই বাগ মানাতে পারত না সেই মশকাক্রমনের। তারপর এল কছুয়া ধূপ। কিছুদিন ব্যাপার কন্ট্রোলে, তারপর আবার যে কে সেই। মাঝখান থেকে ঠাকমার হাঁপানি এমন বাড়ল যে বাড়িতে তানপুরার পুরনো খোল ঢেকে অক্সিজেন সিলিন্ডারের ব্যবস্থা রাখতে হল রাত বিরেতের জন্য। বছরের কয়েকটা সময় মশাদের দাপট একটু কম থাকত। তবে সেটা ঠিক কোন সময়গুলোতে, জীবনবিজ্ঞানে মশার জীবনচক্র ডিটেলে স্টাডি করেও তার সুরাহা করতে পারিনি। তবে মাঝখান থেকে মাধ্যমিকে লাইফ সাইকেলটা কমন আসায় ছাঁকা নম্বর উঠেছিল। 

  শুধু সন্ধে কেন, বিকেলবেলা খেলতে বেরনো থেকেই মোলাকাত হত এই খুদে খুদে সাক্ষাৎ যমদূতদের। কলের বল কাঁচা নর্দমায় পড়ে গেলে, পাঁকে ভেসে থাকা মশার ডিমের স্তরের মধ্যে দিয়ে বুড়বুড়ির জায়গা দেখেই সেটা তুলে আনা হত কাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে। আর সেখান থেকে উড়ে আসত শয়ে শয়ে মশা। খুব ফুর্তির বিকেলে মশার ঝাঁক নিয়ে খেলেওছি কখন সখনও। আকাশের রঙ যখন কমলা থেকে বেগনে হয়ে আসত, সেই সময়, আসে পাশে ঝোপঝাড় আছে এমন জায়গায় দাঁড়িয়ে, ওপর দিকে মুখ তুলে 'চুউ-উ-উ-উ-উ' ডাক লাগালেই মাথার কাছে এসে ঝাঁক বেঁধে গোল হয়ে ঘুরতে লাগত মশার পাল। কিছুজন আবার বিশেষ ক্ষমতা নিয়েই জন্মেছিল বোধহয়, কোন ডাক বা কারসাজি ছাড়াই, তাদের মুণ্ডুর চারপাশে এসে বোঁ-- করে ঘুরতে থাকত চাক চাক মশা। দূর থেকে দেখলে মনে হত 'হ্যালো'ওয়ালা কোন মহাপুরুষ হেঁটে আসছেন; শুধু চাকতির রঙটা কালো হওয়ায় পবিত্রতা নিয়ে একটা স্পিরিচুয়াল প্রশ্ন থেকেই যেত। 

  বাংলার কুটির শিল্পর অবস্থা চিরকালই খারাপ। যে কটা কালক্রমে অবশিষ্ট আছে তার মধ্যে মশারি টাঙানো একটা। এমন একটি সূক্ষ্ম আর্ট কয়েকজন দুঃস্থ শিল্পীর হাত ধরে কোনক্রমে টিকে আছে এক এবং একমাত্র মশাদের কল্যানে। এই যেমন আমার বাবা। জ্ঞান হওয়া ইস্তক ভদ্রলোককে দেখে আসছি মশারি টাঙানোর ব্যাপারটা সি পি এমকে ভোট দেওয়া, আমার অঙ্ক খাতার ছিঁড়ে ফেলার মতোই রিলিজিয়াসলি করে আসতে। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা, রাতে খেতে বসার আগে, পাখাটাকে পাঁচ স্পিডে ঘুরিয়ে, মশারির খুঁট লাগানোর শুরু। দড়ির মাপের কম বেশি, একটা খুঁট নাইলনের, একটা সুতুলির, এইসব চুলচেরা হিসেব দেখে নিয়ে, মশারিটাকে দুর্দান্ত জেলের কায়দায় যখন ছুঁড়ে দিতেন, যেন মনে হত পাঁচ সেরি কাতলা ঘাই মেরেছে, জাস্ট এইবার উঠে আসবে জাল গোটালেই। তারপর চারদিক একদম নিখুঁতভাবে গুঁজতেন গদির এত ভেতর অবধি যে তাকে টেনে বের করে মশারিতে সেঁধনোটা দুর্গম গুহায় প্রবেশের মতোই দুষ্কর হত। তা যা হোক কোনক্রমে ঢোকা তো গেল, আলো টালো নিবিয়ে শোয়ার পরই কানের কাছে মিঠে সানাইয়ের সুর - পোঁ-ওঁ-ওঁ-ওঁ। একটু উপেক্ষা, 'মশারির বাইরে বোধহয়' মর্মে আত্মসান্ত্বনা, তারপর কানের একদম ধার ঘেঁসে ওড়ার আওয়াজ পাওয়া মাত্রই জ্বলে উঠল মাথার কাছে রাখা টর্চ। এলোপাথাড়ি আলোর রেখা ঘুরতে লাগলো মশারির 'কোনে কোনে মে', যেন লাইটহাউসের আলো জাহাজ খুঁজছে কালো সমুদ্রে। কিন্তু পরিশ্রমই সার, জাহাজ তো দূরের কথা, মাস্তুলেরও দেখা মিলল না। অগত্যা মশারি থেকে বেরিয়ে টিউবলাইট জ্বালাও, তারপর আবার ঢুকে এসে মশা খোঁজা শুরু করো। এই ঢোকা বেরোনোতেই আরও গণ্ডাখানেক সেঁধিয়ে গেল আক্রমের ইয়র্কারের মত; আর ঢুকে শালারা কোন ঈশান কোণে ঘাপটি মারত কে জানে! শেষমেশ মশারি খোলা হল, পাখা বাড়ানো হল, জাল ছোঁড়া হল - আলাপ শুরু হল নতুন করে, খেলিয়ে খেলিয়ে মধ্যরাতের রাগ আবার সমে এসে পড়ল গিটকিরি মেরে।

  মামারবাড়ির দাদু আবার প্রিভেন্সানের থেকে কিওরে বেশি বিশ্বাস করতেন। মাসকাবারিতে চাল-ডাল-মশলা-সাবানের সঙ্গে জাম্বো সাইজের ডেটল আসত। মশারি ছাড়া শুতেন, সারা রাত এপাশ ওপাশ ফটাস ফটাস মশা মেরে, ভোর ভোর উঠে, লাল লাল দাগড়া হয়ে যাওয়া জায়গাগুলোতে র-ডেটল লাগিয়ে নিতেন থুপে থুপে। সারা দিন রাত চলত ঘ্যাঁস ঘ্যাঁস চুলকোনো, আর ক্ষণে ক্ষণে ডেটল বর্ষণ।

     এসব ঘটনা যদিও আমার জীবনের, তবু আমি নিশ্চিত, এ পোড়া দেশে এরকম মানুষরা সব পরিবারে, সব ফ্ল্যাটবাড়িতে, পাড়ায় কালোজিরের মত ছড়িয়ে আছে। তবে আমার মেসোর মতন মশা-অবসেসড মানুষের দর্শন কারুর হয়েছে বলে মনে হয় না। যদিও শুধু মেসো না বলে একে মেসো, মাসি আর মশার গল্প বলাই শ্রেয়। 

  মেসো আমার নিপাট ভদ্রলোক। আর শুধু ভদ্রলোক কেন, শিক্ষিত,মার্জিত, সাহিত্য-শিল্প-সঙ্গীতের অনুরাগী একজন সংবেদনশীল ব্যক্তি। তা এই মেসোর যে কটি ব্যাপারে অ্যালার্জি আছে তার মধ্যে মাসি ও মশা হল লিস্টের একদম ওপরে। সিলভার জুবিলি পেরোনো বউয়ের ওপর কার না বিতৃষ্ণা থাকে? তাই মাসির সাথে দাঁত-খিঁচুনির সম্পর্কটা নিয়ে বিশেষ প্রশ্ন নেই, কিন্তু মশার মত একটা ক্ষুদ্র জীবকে নিয়ে তিনি যা করেন সেটা প্রায় ফোবিয়াই বলা চলে। ভদ্রলোক খবরের কাগজ পড়েন খুঁটিয়ে; তাই মাঝে মধ্যেই মশা ও তা বাহিত রোগ সম্মন্ধে যেসব ভয়ঙ্কর খবরগুলো বেরোয় সেগুলো তাঁর চোখ এড়ায় না। আর সেখানে ওমুক বা তমুক রোগের মশা চেনবার যে সহজ উপায়গুলো বাতলানো থাকে সেগুলো তিনি ভাল করে জেনে নেন। তারপর শুরু হয় নিরীক্ষণ। ওই ধরনের কোন মশা ঘরে ঢুকেছে কিনা বোঝবার জন্য ভদ্রলোক চেয়ারে কাঠের মত বসে থাকেন যাতে মশা এসে তাঁর গায়ে বসে। বসলে সেটাকে না মেরে, স্লো-মোশানে হাত তুলে, চোখের সামনে এনে মশার গড়নটা মিলিয়ে দেখেন কাগজের ইলাস্ট্রেশানের সঙ্গে। তারপর থাবড়ে মারেন শত্তুরটাকে। এই মেসোই একবার এক শত্রুকে 'কুল-হেডে' ব্যবহার করেছিলেন আরেক শত্রুকে ঘায়েল করতে: মাসি আমার মোটাসোটা, বেঁটেখাটো মানুষ। মশারির খুঁট লাগানো আর ডিঙি মেরে জিরাফকে বটপাতা খাওয়ানো তাঁর জন্য সমান চ্যালেঞ্জিং। এই মাসির সঙ্গে এক সন্ধের ফাটাফাটি ঝগড়ার পরে, রাগ করে নিরম্বু উপোষ দিয়ে মেসো মশারিটা বিছানার আধখানায় টাঙিয়ে নিয়েছিলেন। ফলে, ওই ভরা মশার সিজনে, বাকি আধখানা খালি খাটে শুতে হয়েছিল মাসিকে। সেই রাতে, মশারির মধ্যে শুয়ে, আড়চোখে বাকি খাটটার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ভদ্রলোকের নিজের কূট-বুদ্ধির জন্য যে বিলক্ষণ গর্ব ও পুলক বোধ হয়েছিল তা আর বলে দিতে হয়না। আর হবে নাই বা কেন? এহেন পলিটিকালি কারেক্ট অথচ দুরন্তভাবে ইফেক্টিভ শাস্তিব্যবস্থার আবিষ্কার গ্যালারিভরা হাততালি ও নিশ্চিতভাবে স্বর্ণ পুরস্কারের যোগ্য। 

  কে বলে ব্যাঙের খাদ্য হওয়া ছাড়া মশার আর কোন কার্যকারিতা নেই? 

(আমার এই লেখাটি ''প্রতিদিন রোববার'-এ প্রকাশিত হয়েছিল।)