Saturday, 21 February 2015

প্রেম প্রতিজ্ঞা পাকামো

'ইস লিয়ে ম্যায়, গাঙ্গাপুত্র দেবব্রৎ, চারো দিশায়োঁ, ধরতি, অউর আকাশ কো সাক্সি মানতে হুয়ে ইয়ে প্রতিজ্ঞা করতা হুঁ কে আজীবন ব্রহ্মচারী রহুঙ্গা, বিবাহ নেহি করুঙ্গা...' মুকেশ খান্না দু'হাত চিতিয়ে ডায়লগটা টিভির স্ক্রিনে আছড়ে দিতেই কেঁপে উঠল বিশ্ব সংসার - আকাশ খান খান হয়ে গেল গুড়ুম গুড়ুম বাজ পড়ে, সমুদ্রের জল উথাল পাথাল, মেয়ের বাপ ধীবর বেচারা কাঁচুমাচু হয়ে এককোণে, অন্তরীক্ষ থেকে দেবতারূপী এক্সট্রারা মুঠো মুঠো ফুল ফেলছে, দৈববাণী বলে দিচ্ছে এবার থেকে এর নাম হল ভীষ্ম... এই হল প্রতিজ্ঞা ব্যাপারটার সাথে আমার 'লাইভ' পরিচয়। এর আগে মহাভারত পড়েছি, বিভিন্ন পুরাণের গল্পও, ব্যাপারটা জানতাম, কিন্তু সাক্ষাৎ করার সুযোগ হয়নি। এইবার বুঝলাম 'প্রতিজ্ঞা' ব্যাপারটা মারাত্মক! দিয়ে দেওয়া মানে ধরে নেওয়া হবে এই শেষ কথা; পৃথিবী রসাতলে যাক, এ কথার নট নড়নচড়ন! তবে একটা প্রশ্ন মাথায় এসেছিল - আমাদের পাড়ার গোপালকাকুও বিয়ে করেনি, বললেই বলে করবেও না কখনও, এরকমই কাটিয়ে দেবে ভাইপো-ভাইজি নিয়ে। তা তাকে নিয়ে তো তেমন কিছু হয়নি? বরঞ্চ বড়-ছোট সবাই বলাবলি করে শেষ বয়েসে লোক হাসিয়ে ঠিক ফাঁসিকাঠে উঠবে ব্যাটা। নিজেকে বোঝালাম, ও সব সত্য যুগের ঘটনা, এখনের মত ঘোর কলি নয়, তাছাড়া সব রাজা রাজড়ার ব্যাপার, ছেলে বাপের বিয়ে দেবার জন্য ব্যাচেলার থেকে যাবে এটা কেরানীর ছেলে গোপালকাকুর সাথে মিলবে কেন। আর পরে এও খেয়াল করলাম যে গোপালকাকু 'প্রতিজ্ঞা' বলেনা, বলে 'পোতিজ্ঞা'। গলাও মিকি মাউস মার্কা'। তা সেই 'পোতিজ্ঞা' যে স্বর্গলোক অবধি পৌঁছবে আর তাতে সুগন্ধি ফুল বর্ষণ হবে, এটা ভাবা নেহাতই বাড়াবাড়ি!

       যাই হোক, এ ভাবেই ঘরোয়া 'মাক্কালীর দিব্যি' থেকে গুরুগম্ভীর 'প্রতিজ্ঞা'য় উত্তরণ হল। প্রায় একই সঙ্গে হিন্দি সিরিয়ালের খাল-বিল পেরিয়ে হিন্দি সিনেমার চওড়া নদীতে ডিঙি ভাসল আসতে আসতে । প্রেম-প্রতিজ্ঞা-পাকামোর ঝোড়ো হাওয়া এসে লাগতে থাকল মুহুর্মুহু! ঘরোয়া মাইরি-মাকালী, দেবভাষা প্রতিজ্ঞার গায়ে গায়ে, গলায় রুমাল, সাদা প্যান্ট, কান ঢাকা চুল, সফেদ থান কাপড়, ডুকরে উঠে চুড়ি ভাঙা, রক্তমাখা 'কসম', 'ওয়াদা', 'বচন' এসে জুড়তে লাগল আমাদের দৈনন্দিন ভোক্যাবে। এর বাংলা সংস্করণে 'কথা দেওয়া' ব্যাপারটাও চালু হল আসতে আসতে। 'প্রমিস' শিখতে তখনও বহু ক্যালেন্ডারের পাতা ওলটাতে হবে।

  সত্যি বলতে কি, একে নিয়ে যতই মস্করা মাচাই, হিন্দি-বাংলা কমার্শিয়াল সিনেমার হাত ধরেই বোধহয় আমাদের রোজকার জীবনে 'দেওয়া' কথাকে সিরিয়াসলি 'নিতে' শেখা। পুরান-পঞ্চতন্ত্র-মহাকাব্যে এর বহু উদাহরণ আছে নিশ্চয়ই, কিন্তু সাড়ে পাঁচ ফিট মধ্যবিত্ত বাঙালির কাঠামোয় ওইসব দৈবিক জিনিস ফিট হওয়ার নয়। তাই আগে টুকটাক মিথ্যেগুলো চালাবার জন্য ছিঁচকে মাইরি-মাকালী, আর একটু সিরিয়াস ব্যাপার হলে ঘরোয়া যাহোক কিছুর 'দিব্যি'-র হাতযশই সম্বল ছিল। যেমন, শীতের রাত সাড়ে বারোটায় এসে দরজা পেটানো মাতাল দাদাকে বউদি দরজা না খুলে দিলে পাড়াসুদ্ধু লোক জানতে পারত দাদা বউদির দিব্যি দিল যে আর কক্ষনও খাবেনা। পরদিন সকালে লুঙ্গি গুটিয়ে ফুলকপি দর করার সময়ই সেসব আর কেউ মনে রাখত না - বউদি তো না-ই। আবার রাত হলেই রোজের রুটিন। সবাই জানত ওসব কথার কথা, কুয়াশার মতই উবে যাবে দিন ফর্সা হলেই।  

  তবু কথা দেওয়া, কথা রাখার স্বপ্ন, কথা ভাঙার ভয়, আর শেষমেশ সব হিসেব মিলিয়ে দিয়ে সেই কথা রাখা - তাতে যদি মরতেও হয় হল, এ ভাবেই তৈরি হয়ে উঠেছে একের পর এক হিট-ফ্লপ হিন্দি-বাংলা ছবি। সিটের একদম সামনে এসে, ধুকপুকে বুকে মানুষ দেখে গেছে এই 'জবান' দেবার পরীক্ষা, 'কসম' খাওয়ার অক্লান্ত উপাখ্যান...

  বাবা মিঠুন মারা যেতে, ছেলেকে দেখিয়ে মা স্মিতা পাটিল 'কসম' খেলেন এই ছেলে বড় হয়ে বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধ নেবেই। কথা রাখতে ছেলে বড় হয়ে আবার হয়ে উঠল ডাকাবুকো আর এক মিঠুন। বদলা নিল গোবেচারা বাবার ওপর হওয়া সব অন্যায়ের, মাকে ফিরিয়ে দিল সম্মানের সংসার... 
একের পর এক নায়ক সমুদ্রের ধারে, বিস্তীর্ণ পাহাড়ের ঢালে, তুমুল বৃষ্টিতে, গোপনে বা হাজার গোপিনী সাক্ষী রেখে বলে গেছে 'ওয়াদা রাহা সনম , হোঙ্গে জুদা না হম'। ভাষার তারতম্য হয়েছে হয়ত কখনও সখনও, কিন্তু মূল ভাব বদলায়নি একটুকুও। তারপর ভিলেনের চালে বা নিজেদের ভুল বোঝাবুঝির প্যাঁচে সম্পর্ক ছিন্নভিন্ন।  মদের ফোয়ারা, চোখের জলের স্রোত। কথা রাখতে শেষ সিনে সুখের মিলন বা একে অপরকে না পেলে এক সাথে নিজেদের শেষ করে দেওয়া...

  রাগি বাবা অথবা অভিমানী মা রাতের অন্ধকারে দেখা করেছেন ছেলের প্রেমিকা বা মেয়ের প্রেমিকের সঙ্গে। 'ওয়াদা' করিয়েছেন যে তাঁর মেয়ে বা ছেলের সাথে আর কখনও দেখা করবেনা প্রেমিক বা প্রেমিকা। অথবা চলে যাবে ওই জায়গা ছেড়ে কোন দূর শহরে। নাহলে ভয়ঙ্কর কোন ক্ষতি হবে তার ভালোবাসার - ভগবানের দিব্যি! মনের মানুষের মঙ্গালার্থে তাকেই ছেড়ে দিয়ে চলে গেছে নায়ক বা নায়িকা। টুঁ শব্দটি করেনি অবধি। শেষ পর্যন্ত ভালোবাসার কাছে হার মেনেছে মা-বাবার জেদ। তারাই বলে দিয়েছেন আসল কারন, মিলিয়ে দিয়েছেন প্রেমিকযুগলকে...

  শহুরে বাবু গ্রামে এসে প্রেমে পড়ে সেখানের এক লাজুক মেয়ের। অসম পারিবারিক ও সামাজিক অবস্থার প্রাথমিক জড়তা কাটিয়ে ধরা দেয় প্রেমিকা। দুর্নাম রটে গ্রামে। বিচ্ছেদ যখন অনিবার্য তখন মেয়েটি জীবন দেয় ছেলেটির জন্য। যাবার আগে কথা দিয়ে যায় সে আবার আসবে। কথা রাখতে হুবহু দেখতে আরেক অনাঘ্রাতার শরীরে জায়গা করে সেই অশরীরী আত্মা। জাতিস্মর হয়ে ফিরে আসে 'বাবুজি'র কাছে...   

  'শোলে'। অমিতাভ-ধর্মেন্দ্র জয়-ভিরু হলায় গলায় বন্ধু। চোরে চোরে মাসতুতো ভাই। ঠাকুর সঞ্জীব কুমার দু'জনকে নিয়ে এলেন ডাকু গব্বরকে জব্দ করতে। শর্ত - জীবন্ত গব্বরকে চাই তাঁর। নিজে হাতে শেষ করবেন তাঁর সুখের পরিবারকে যে ধ্বংস করেছে তাকে। অনেক ঘাত-প্রতিঘাত, হাসি, কান্না, প্রেম পেরিয়ে গল্প পরিণতির দিকে।  এবার শেষ কামড় দেবার জন্য যেতে হবে জয় অথবা ভিরুকে। এই যাওয়ার অর্থ মৃত্যু। কে যাবে? কিউই চায় না অন্যকে বিপদের মুখে ছাড়তে। জয় বলল, এত ভাবার কিছু নেই। প্রতিবারের মত সে পকেট থেকে বার করল তার পয়া 'কয়েন'। যে জিতবে সে যাবে। শূন্যে উড়ল কয়েন। প্রতিবারের মত জিতল জয়। ভিরু জানতেও পারল না এক-রকমের দু'পিঠ ওয়ালা কয়েন দিয়ে আজীবন তাকে ঠকিয়ে এসেছে জয় আর এই শেষবারও তাকে ঠকিয়ে, প্রেমিকার কাছে রেখে চলল মৃত্যুর মোলাকাত করতে।  আর ফিরতে পারল না জয়। ভিরু গিয়ে ধরাশায়ী করল ডাকাতসর্দারকে। রক্ত তার মাথায়। বন্ধুর মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে যখন খুন করতে যাবে গব্বরকে, শুভ্রকেশ প্রৌঢ়ের ছায়া পড়ল রণভূমিতে, 'তুমি ওকে আমার হাতে তুলে দেবে। তোমার বন্ধু আমাকে "ওয়াদা" করেছিল আমাকে জীবন্ত গব্বর দেবে।' মৃত বন্ধুর দেওয়া কথা রাখল বন্ধু, গিলে ফেলল নিজের হিংস্র রাগ...

  এছাড়াও প্রচুর কঠিন প্রতিজ্ঞার উদাহরন ছড়িয়ে আছে হাজার হাজার ছায়াছবির আনাচে কানাচে। কত শত হিরে জহরতের টুকরো ছড়ানো গানের সুরে রয়েছে বিরহ-অভিমানের কথা দেওয়া-নেওয়ার রূপকথা। আছে ওয়াদা-কসমের সকরুণ ব্যাকড্রপে মা-ছেলে, বাবা-মেয়ের চরম ঘাত-প্রতিঘাত। উল্টো পুরাণও আছে। এক অস্ত্র ব্যবসায়ীর দিয়ে ফেলা কথা না রাখতে পারলে ফল কি হতে পারে এক মোক্ষম সংলাপে বুঝিয়ে দিয়েছে উগ্রপন্থী নেতা - দেওয়া 'জবান' না রাখতে পারলে তার 'জবান' (জিভ) টেনে ছিঁড়ে নেওয়া হবে। ভয়ঙ্কর!

  আজ এই গল্পগুলো বেহিসেবি আড্ডায় অজস্র হাসির খোরাক দেয়। ছোটবেলার কাজল ধ্যাবড়ানো ছবির মতই মজা লাগে হঠাৎ কোন দুপুরে চ্যানেল ঘোরাতে ঘোরাতে এমন কিছু সিনেমা পেয়ে গেলে। বহু যত্নে বোনা সেদিনের সেই তুখোড় ডায়লগ আজ ভরদুপুরে জোগান দেয় কমেডির হররার। কিন্তু তখন তো তেমন লাগত না! এ আর এমনকি আগের কথা যে এত 'ডেটেড' হয়ে গেল ধ্যান-ধারনা? যত্রতত্র ইন্টারনেট আর রকমারি গ্যাজেটের ছড়াছড়ি ছাড়া এমন কি নতুন এল জীবনে যে এই সেদিনের সিরিয়াস কথা আজ কমিক ঠেকে? আসলে তা বোধহয় নয়। যে কারনে দশ বছর আগের গল্প এখন 'পিরিয়ড' লাগে, সেই গ্লোবালাইজেসনের দুদ্দাড় বাইকে চেপেই আমরা হড়কে গিয়েছি কয়েক হাজার আলোকবর্ষ। সামাজিক পটভূমিকাটা এতটাই বদলে গেছে যে এক যুগ আগের নিজেকে স্বীকার করতেই কেমন লজ্জাবোধ হয় আজকাল। এই সেদিনও জীবন এতটাই ইনোসেন্ট ছিল যে সেসব ভাবাবেগের কথকতা নাগাড়ে বিশ্বাস করে গেছি সকলে। নায়ক মায়ের কাছে কথা না রাখতে পারার কষ্ট আমাদের  গলার কাছেও কি ডেলা হয়ে জমে থাকেনি কোনদিন? কথা দিয়ে মারা যাওয়া প্রেমিক-প্রেমিকা যে আবার এক হবে পরের জন্মে তা কি আমরাও বিশ্বাস করিনি নাগাড়ে? জামার কলার, প্যান্টের ঘের, সালোয়ারের কাটিং, চুলের ফের, শাড়ির আঁচলের ডিজাইনের সাথে সাথে কোন অজান্তে যে চুঁইয়ে চুঁইয়ে ঢুকে গেছে কথা দেওয়া আর কথা রাখার এক সরল অথচ গভীর মূল্যবোধ, আমরা টেরও পাইনি কেউ। অন্যদের তো বটেই, নিজেকেও নিজে কথা দিয়েছি অসংখ্যবার। হয়ত একটু নাটকীয় ভাবে বলেছি, কিন্তু তাতে সততার কোন অভাব ছিলনা সেদিন। কথা রাখতে পারিনি সবসময়, কিন্তু না রাখতে পেরে অপরাধীও কি হইনি বিবেকের কাছে? আবার হয়ত কখনও জীবন থেকেও 'কসম-ওয়াদা'র গল্প ধার নিয়েছে চলচ্চিত্র, বাস্তবের কোন কথা না রাখার মর্মান্তিক পরিণতি হাল ফিরিয়েছে বক্স অফিসের। এরকম ভাবেই 'রিল' আর 'রিয়েল' দুটো সমান্তরাল জীবন কথা চালাচালি করে পাশাপাশি হাতেহাত পথ হেঁটেছে আজীবন। 

  তারপর দিন বদলালো। ঝকঝকে স্মার্ট জীবন এসে থাবা বসাল ছাপোষা সেন্টিমেন্টে।  বি আর থেকে প্রেম হয়ে আদিত্য চোপড়ায় ল্যান্ড করলাম সদলবলে। বস্তুবাদিতা শেখাল শর্তসাপেক্ষে বাঁচা। সিনেমাও গায়ে গায়ে ঘেঁসে এল জীবনের। আরও বেশি বস্তু, আরও বেশি বাস্তব জায়গা করে নিল সেলুলয়েডে। 'কসম', 'ওয়াদা', 'বচন', 'কথা দিলাম'-কে সরিয়ে কবে যেন ঢুকে পড়ল আলপটকা 'প্রমিস'। হাতে হাতে তালি মেরে ছোট্ট একখানা 'প্রমিস' করে এখনকার নওজয়ানেরা। যে প্রমিস করে সেও মনে রাখেনা সে কথা, যাকে দেয় সেও ভুলে যায় আড়াই পা গিয়ে। আসলে যার-যার তার-তার জীবনে এসব ছেঁদো সেন্টিমেন্টের জায়গা নেই মোটে। হোয়াটসঅ্যাপের ফাইভস্টার ঘাটে সাধাসিধে ডিঙিনৌকো ভেড়েনা কক্ষনও, মূল্যবোধ এখন মূল্যধরে দেওয়া যায় মোবাইল এর ব্যালেন্স থেকেই, 'কসম' ওয়াদা'র মত ন্যাতাক্যাতা উর্দু শব্দ উচ্চারন করেনা এন আর আই সিনে-ললনার ওষ্ঠ, ডিজের রিমিক্সে কবে যেন ঢাকা পড়ে গেছে 'কসমে ওয়াদে নিভায়েঙ্গে হাম'-এর ব্যারিটোন...

  তবু আজও কোথাও কোথাও - 'ম্যায় একবার বচন দেতা হুঁ তো খুদকা ভি নাহি সুনতা' - ভাগ্যিস সলমন ছিল, কি দুর্দশাটাই না হত তা না হলে! এপাং ওপাং দাবাং...

(আমার এই লেখাটি 'প্রতিদিন রোববার'-এ ৮ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৫-তে প্রকাশিত হয়েছিল।)