Friday, 6 March 2015

প্রতিবাদ থেকে দূরে

ইদানীং নিজের মনে একটু টানাপোড়েন কাজ করে। হয়ত কিছুটা অপরাধবোধও। সমাজে, আমাদের চারদিকে যা যা ঘটে চলেছে তা যে কোনো মানুষকেই নাড়িয়ে দেবার পক্ষে যথেষ্ঠ। যার যা জোরের জায়গা তাই দিয়ে, কিছুটা হলেও প্রতিবাদ করা, বা নিদেনপক্ষে রাষ্ট্রকে বুঝিয়ে দেওয়া যে এসব আমার ভালো লাগছে না এবং এর আমি বিহিত চাই, এটা বোধহয় খুব জরুরী হয়ে পড়েছে আজকাল। আমি যেহেতু একটু আধটু লিখতে পারি, বেশ খানিকটা অনুভব ক্ষমতাও আছে বলে মনে করি, তাই শব্দই হতে পারে আমার হাতিয়ার। ঝলসে উঠে টুকরো টুকরো করে দিতে পারুক না পারুক,তরবারি উঁচিয়ে ধরে জানান দেওয়াটা সত্যিই আজ দরকারি। 

       তবু কেন জানিনা আমি তা করিনা। রাগে মাথার রগ দপদপ করে, কান্না চাপতে গিয়ে গলার কাছটা ব্যথা করে ওঠে, ভয়ে মুখের ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়, তবু এইসব নিয়ে বিশেষ কিছু বলে ওঠা হয়না। আমার নিজের ব্লগ আছে সেখানে চাইলে লিখতেই পারি, ফেসবুকের দেওয়ালে লিখতে পারি, খবরের কাগজ বা পত্রিকাতেও একটু আধটু লিখি, তাই সেখানেও নিজের বক্তব্য প্রকাশ করা যে খুব কঠিন তা নয়। কিন্তু লিখিনা। রাষ্ট্রের ভয় পাই?  আমার যে অতদূর এলেম আছে  তা মনে হয়না। তাহলে? কেন লিখিনা? কেন ব্যঙ্গ করিনা প্রত্যেকদিন হয়ে চলা জোকারপনার? কেন প্রতিবাদ করিনা দিনরাত ঘটে চলা হিংসা, হানাহানি, ধর্মের নামে চুড়ান্ত অধর্মের?

       আজ অনেক ভাবছিলাম এটা নিয়ে। কিছুক্ষণ গুম মেরে বসে থাকার পর মাথাটা যখন একটু ঠাণ্ডা হল তখন মনে হল যে যা কিছু নিত্যদিন ঘটছে, যাকে বলে 'কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স', তাতে সবারই কিছু না কিছু বিশেষ মতামত থাকতে হবে, বা থাকলেও তাই নিয়ে কথা বলতে হবে, এমন কোন মানে আছে কি? মেনে না নেওয়া মানেই কি প্রতিবাদী আওয়াজ তোলা? চুপ করে, বিষ কি গিলে ফেলা  যায়না? বলার না থাকলেও বলতেই হবে কিছু না কিছু? ছোটবেলার গল্প যেমন এখন ফিরে ফিরে আসে লেখায়-গল্পে, তেমনি আজকের কথা হয়ত অক্ষরের সারি হয়ে হানা দেবে ভবিষ্যতে কখনও;  সময়মত তার প্রকাশ হবে।আবার হয়ত এখনই কোন কোনদিন এখনই বেরিয়ে আসবে গোলাবারুদ। বা হয়ত হবেই না কক্ষনও। থিতিয়ে যাবে দৈনন্দিনতার ঘূর্ণিপাকে। দেখাই যাক না। স্বাভাবিকভাবে যা আসে সেটাই কি সৎ নয়? চাপানো, জোর করে প্রকাশের মধ্যেও তো একটা অশোভন কৃত্রিমতা আছে। 

       তার চেয়ে যেটা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সৃষ্টি করতে পারছি তাই করিনা। অশান্তি, অন্যায়ের প্রতিবাদ যেমন জরুরি, তেমনই তার পাশাপাশি সুস্থ, সাবলীল গড়ে যাওয়াটাও কি দরকারি নয়? একদল দাবানল নেভাবে আর একদল নতুন গাছের চারা রোপণ করে যাবে এটাই তো সুস্থতা, এতেই তো ভারসাম্য। 

       জানি এই মুহূর্তে কোথাও না কোথাও খুন হচ্ছে, হচ্ছে ধর্ষণ, অস্ত্রের বোঝা খুলে সওয়ারি চলছে খোলাখুলি, গোপন ডেরায় জরিপ চলছে ক্ষমতা দখলের। তবু আমি যদি তা নিয়ে কিছু না বলে,কয়েকটা বাচ্ছাকে আকাশ চেনাই, ছায়াপথ খুঁজি সাথে বসে, কালপুরুষের বেল্ট বানাতে শেখাই ওদের, বলি দেশ-বিদেশের গল্প, বন্ধুত্ব করাই পাড়ার কুকুরছানাগুলোর সঙ্গে,পাখি কিনে উড়িয়ে দি, ভাল কিছু সাহিত্যর চেষ্টা করি ঘাড় গুঁজে, নিজের অফিসের কাজটা করি ভালো করে যাতে কোম্পানিটা বড় হয়, আরও কিছু লোকের চাকরি হয় আর দেশের আর্থিক উন্নতি হয় নামমাত্র হলেও -  সেটা কি মুঠো উঁচিয়ে প্রতিবাদের চেয়ে কম কিছু? ভাঙন আটকানো যতটা দরকার, নতুন গড়ার কাজও কি অনবরত দরকার নেই বেঁচে থাকতে? 

       তাই, যা ভালো পারি, অসৎ না হয়ে, অবান্তর না হয়ে, করে যাই। অন্ধকারে মশালের আলো হয়ত ধরতে নাই পারলাম, নতুন ভোর এনে কালো রাত কাটানোর চেষ্টা তো করতেই পারি। যার যা কাজ, সেটা ভালো করে করলেই তো সবটা হয়ে যায়। যায় না?