Thursday, 12 March 2015

পায়ে পায়ে সুন্দরবন আর দুই বন্ধুর গল্প

কিছুদিন আগে অফিসের কয়েকজন মিলে সুন্দরবন বেড়িয়ে এলাম। সমস্ত ব্যবস্থা করেছিল "পায়ে পায়ে ট্রাভেল এজেন্সি"। সংস্থার কর্ণধার রজত পোদ্দার নিজে আমাদের সঙ্গে গিয়ে সব দেখাশোনা করেছিল। রজত আর ওর সব কর্মচারীদের অসাধারণ সার্ভিসে আমরা সবাই মুগ্ধ। রান্নাবান্না থেকে থাকার ব্যবস্থা, বোটে করে বিপজ্জনক খাঁড়িতে নিয়ে যাওয়া থেকে বনবিবির পালা দেখানো - সবকিছু চমৎকার। কত রকম নতুন নতুন মাছ খেয়েছি দু'দিন বোটে বসে তার ইয়ত্তা নেই। আমাদের পানের আসর আরেকটু সাজিয়ে তুলতে রজত বোট নিয়ে এপার ওপার করেছে কাঁচের গ্লাসের খোঁজে।

       তবে রজতের একটা অন্য পরিচয়ও আছে। ও আমার জীবনের প্রথম বন্ধু। রজত আর আমি প্রি-স্কুল থেকে একসাথে পড়েছি। বাড়িও ছিল একদম কাছেই। তাই সারাদিনই চলত আড্ডা -খেলা। এখনও পুরনো অ্যালবাম খুললে আমার জন্মদিনের ছবিতে ওর হাসিমুখ প্রায়শই বেরোয়। কৈশোর বা সদ্য যৌবনের যেকোনো ঘটনার সাথেও দু'জনের অনেক স্মৃতি। ওর বউ আমাদের ক্লাসমেট। আমার বউয়ের সাথে আমার সে সময়ের প্রেমেও রজত প্রচুর খেটেছে। তারপর অনেক ক্রিকেট ব্যাট, জমানো টিকিট, কমিক্স বই, টিউশান ক্লাসের মত বন্ধুত্বটাও হারিয়ে গেল সময়ের স্রোতে। খবর রাখলাম একে অন্যের, কিন্তু যোগাযোগটা প্রায় চলে গেল। ব্যস্ত হয়ে গেলাম দু'জনে কবে যেন।

       বড় হয়ে বন্ধু পাওয়া মুশকিল; কিন্তু তার চেয়েও মুশকিল বড় হয়ে ছোটবেলার বন্ধু ফেরত পাওয়া। আমি ভাগ্যবান। দু'টোই পেয়েছি। আমার এখনকার বন্ধুরা, যারা আমার অফিস কলিগও বটে, ভীষণ কাছের। মনেই হয় না ওদের আগে চিনতাম না। তেমনি রজতও ফিরে এলো হঠাৎ করেই। এবারে সুন্দরবনে পৌঁছে, লঞ্চে ওঠার সময় যখন ওর সাথে দেখা হল। মনেই হলনা যে পনেরো বছর আমরা একে অন্যকে সামনাসামনি দেখিনি। অনেকদিন পর বাড়ি ফিরে, নিজের ঘরে এলে মানুষের যেমন একটা স্বস্তি বোধ হয়, রজতের সাথে দেখা হয়েও তেমনই লাগল। তারপর রঙিন আড্ডা, পুরনো কথা, মাঝখানের সময়টার গল্প সব চলল। আমার এখনের বন্ধুরাও ওর বন্ধু হয়ে গেল চট করেই। সবাই মিলে একটা দল হলাম।

       আর হারিয়ে ফেলব না রজতকে। আর একটু জড়িয়েজাপটে রাখব বন্ধুত্বকে। যোগাযোগ বাড়িয়ে আর একটু যত্ন দেব সম্পর্কটাকে।

       সুন্দরবন থেকে আসার পর সবাই জিগ্যেস করল বাঘ দেখেছি কিনা। দেখিনি। মেয়েকে বলার জন্য নিয়ে আসতে পারিনি দুর্ধর্ষ কোনো অভিজ্ঞতা। শুধুই নিজের জন্য উদ্ধার করে এনেছি হারিয়ে যাওয়া, মান্ধাতার আমলের একটা পুরনো বন্ধুত্ব - যার রঙটা এখনও ঝকঝকে সোনার মত, আর আর তার ওপর বসানো আছে একটা মহামূল্য হিরের টুকরো - ছোটবেলা!